ভোরের আলো ফোটার আগেই সাভারের বাসস্ট্যান্ড, আশুলিয়ার বাইপাইল কিংবা জিরাবো এলাকা ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সকাল ছয়টার দিকে রাস্তাজুড়ে দেখা যায় অসংখ্য নারী শ্রমিকের ছুটে চলা। কারও চোখে ঘুমের ছাপ, কারও হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, আবার কারও কোলে ঘুমন্ত শিশু। কারখানার সাইরেনের ডাক যেন তাদের প্রতিদিনের জীবনের ছন্দ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে সচল রাখার এই নারীদের কাছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি প্রতিদিনের সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।
সাভারের একটি পোশাক কারখানায় প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছেন রহিমা বেগম। নারী দিবসের সকালেও তিনি অন্য দিনের মতোই কর্মস্থলের পথে। কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, অনেকেই বলেন এই দিনটি নারীদের জন্য বিশেষ। কিন্তু তাদের কাছে প্রতিটি দিনই কাজের দিন। কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করার পর বাসায় ফিরে সংসারের দায়িত্বও পালন করতে হয়। তবুও মাস শেষে নিজের উপার্জিত অর্থ হাতে পেলে মনে হয়, তিনি কারও ওপর নির্ভরশীল নন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আর এই খাতের বড় অংশজুড়েই আছেন নারী শ্রমিকরা। ভোরের এই দীর্ঘ যাত্রা, কারখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ এবং সংসারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তাদের প্রতিদিনের জীবন যেন এক নিরন্তর সংগ্রামের গল্প।
গত কয়েক বছরে পোশাক খাতে কর্মপরিবেশে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন ঘটলেও অনেক শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। বিশেষ করে কর্মঘণ্টা, মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন এখনও আলোচনায় রয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রাও। ২০২৬ সালে এসে সাভারের অনেক নারী শ্রমিক প্রযুক্তি ব্যবহারে আগের তুলনায় অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তাদের হাতে এখন স্মার্টফোন, তারা অনলাইন লেনদেন করতে পারেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কাজের ফাঁকে বা অবসরে ইউটিউব কিংবা ফেসবুক দেখে নতুন কিছু শেখার চেষ্টাও করছেন অনেকে। এতে শুধু তাদের দক্ষতাই বাড়ছে না, আত্মবিশ্বাসও বাড়ছে।
সাভারের এসব নারী শ্রমিক কেবল পোশাক তৈরির কারিগর নন; তারা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিন ভোরে তাদের এই ছুটে চলা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার নীরব গল্প বলে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাদের জন্য শুধু শুভেচ্ছা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সমাজে যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা। তাহলেই এই শ্রমজীবী নারীদের প্রতিদিনের সংগ্রাম সত্যিকার অর্থে সম্মানিত হবে, আর নারী দিবসের তাৎপর্যও পূর্ণতা পাবে।

