রপ্তানি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পাশাপাশি কম রাজস্ব আদায়, ঝিমিয়ে পড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ঋণের বাড়তি সুদের হার দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করে তুলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক উপস্থাপনায় দেশের অর্থনীতির এসব অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়।
সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার কম থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগের ক্ষমতা দিন দিন সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ২০১৬ সালে বিদেশি ঋণের গড় সুদহার যেখানে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশের নিচে ছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে দেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০১৯ সালে দেশে ১৮৫ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিনিয়োগ এলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২৭ কোটি ডলারে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম মেনে রপ্তানি খাতে সরাসরি নগদ প্রণোদনা বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮ হাজার ৬৮ ৯ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও এই খাতে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর পাশাপাশি বিগত বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণের করছাড় উপভোগ করেছেন দেশের রপ্তানিকারকেরা। তবে বিএফটিআই পরামর্শ দিয়েছে, সরাসরি অর্থ বা করছাড় না দিয়ে এখন থেকে কারখানার আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি ও শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন কেন্দ্রিক সহায়তা এবং বিশ্বমানের পরিবেশগত মান নিশ্চিতকরণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত।
দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হয় এবং এখানে জটিল ও স্পর্শকাতর নানা ওষুধ তৈরি হচ্ছে। বিএফটিআইয়ের মূল্যায়ন বলছে, এলডিসি উত্তরণের পরপরই বাজারে থাকা জেনেরিক ওষুধের দামে বড় কোনো পরিবর্তনের আশঙ্কা নেই। তবে উত্তরণের তিন থেকে চার বছর পর নতুন পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ তখন বিদেশি স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত রয়্যালটি দাবি করতে পারে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের বার্ষিক চাঁদার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের মূল বাজেটে বাংলাদেশের চাঁদার হার শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ হতে পারে। তবে বিএফটিআই নিশ্চিত করেছে যে, এলডিসি উত্তরণের ফলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাতিসংঘ কিংবা পশ্চিমা উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া তহবিল বন্ধ হয়ে যাবে না।
২০২১ সালে এলডিসি উত্তরণের সুপারিশ পাওয়ার পর বাংলাদেশকে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির ঊর্ধ্বগতি, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় সেই সময় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরের ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া নতুন পরিস্থিতি প্রস্তুতিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। এসব সংকট সামাল দিতে মূল্যবান সময়ের বড় একটি অংশ পার হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুতিকালের মেয়াদ বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে একটি মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে সরকার ২০২৬ থেকে ২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য একটি চার পর্বের জাতীয় পথনকশা গ্রহণ করেছে। রোডম্যাপের শুরুর দিকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থায়িত্ব আনা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, ব্যবসার নিয়মকানুন সহজ করা, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এরপর মধ্যমেয়াদে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান, ওষুধ ও মেধাস্বত্ব আইনের প্রস্তুতি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এসএমই খাতের বিকাশে কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পরবর্তী ধাপে শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসারিত করা, শ্রমিকের মান নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক মানের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ও সবুজ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সর্বশেষ পর্বে সার্বিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষে নীতি, শুল্ক ও অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে একটি স্থায়ী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।


