বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জুলহাস উদ্দিন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্থবিরতা কাটানো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি গ্রহণ করেছেন মেগা পরিকল্পনা। সম্প্রতি টেক্সটাইল মিররকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে কথা বলেছেন।
টেক্সটাইল মিরর : উপাচার্য হিসেবে আপনার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় বছর হতে চলল। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। সরকার পরিবর্তন হয়েছে। সব মিলিয়ে কেমন চলছে?
উপাচার্য: আলহামদুলিল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয় বেশ ভালো চলছে। আমি ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলাম এবং পরদিন ২৮ অক্টোবর যোগদান করি । তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল এবং একাডেমিক অনেক জটিলতা বিদ্যমান ছিল । আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সবার সহযোগিতায় একাডেমিক কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত ও আপ টু ডেট পর্যায়ে নিয়ে এসেছি । এখন আমাদের ছয় মাসের সেমিস্টার ঠিক ছয় মাসেই শেষ হচ্ছে। এমনকি সর্বশেষ ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হয়েছে, যা আমাদের একটি বড় একাডেমিক অর্জন ।
টেক্সটাইল মিরর : বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে আপনারা বড় কিছু প্রকল্পের কথা বলছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন কি?
উপাচার্য: আমরা বেশ কিছু বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হলো অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৪ তলা বিশিষ্ট একটি মাল্টিস্টোরি বিল্ডিং ( বহুতল ভবন) নির্মাণ । এই ভবনটি একাডেমিক ও প্রশাসনিক উভয় কাজে ব্যবহৃত হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি মাইলস্টোন হবে । এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য আমরা ৩ কোটি ১২ লক্ষ টাকার একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্প হাতে নিয়েছি । আমাদের যেহেতু জায়গার স্বল্পতা রয়েছে, তাই স্ট্রাকচারাল মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে আমরা উল্লম্বভাবে (ভার্টিক্যালি) অবকাঠামো বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছি । আগামী এক বছরের মধ্যে এই মাস্টারপ্ল্যান সম্পন্ন হবে ।
টেক্সটাইল মিরর : পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে একাডেমিক ক্ষেত্রে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
উপাচার্য: অবশ্যই। বর্তমানে আমাদের ১৫টি বিভাগ রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারের চাহিদা মাথায় রেখে আমরা আরও নতুন বিভাগ খোলার পরিকল্পনা করছি । আমাদের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা । বর্তমানে আমাদের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট দেশের বাইরে ক্যারিয়ার গড়ছেন । তারা যেন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও বেশি দক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে, সেজন্য আমরা একটি সমৃদ্ধ ‘একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরি করছি, যা আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে ইনশাআল্লাহ ।
টেক্সটাইল মিরর : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে অনেকগুলো ছাত্র আন্দোলন হয়েছে আবার বর্তমান সরকারের আমলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়েছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে কি?
উপাচার্য: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটপরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ছিল, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টিও সামনে এসেছিল । তবে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, শিক্ষার্থীদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি এবং এক্ষেত্রে আমি কোনো মহলের চাপ অনুভব করিনি । সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষাই আমাদের মূল অগ্রাধিকার ছিল ।
টেক্সটাইল মিরর: আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। এই পরিবর্তনের ফলে বা ছাত্র রাজনীতি আবারও চালু করার জন্য আপনার ওপর কি কোনো বিশেষ চাপ ছিল?
উপাচার্য: আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ছাত্র বা শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্তে আমার ওপর কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ ছিল না। আমি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করি নি, আগে থেকেই বুটেক্সে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। তৎকালীন শিক্ষার্থীদের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য যা করা প্রয়োজন, আমি তাই করেছি। আমি কোনো মহলের চাপ অনুভব করিনি।
টেক্সটাইল মিরর: বিএনপি সরকার বর্তমানে ক্ষমতায়, তবুও ছাত্রদল বুটেক্সে ছাত্ররাজনীতি করতে পারছে না, কিন্তু অভিযোগ আছে যে ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও অনেক সংগঠন পরিচয় গোপন করে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
উপাচার্য: দেখুন, এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমার কাছে এখনো নেই । যেহেতু ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা আছে, তাই আমরা অত্যন্ত সতর্ক। যদি পরিচয় গোপন করে কেউ কার্যক্রম চালায় এবং তার সত্যতা পাওয়া যায়, তবে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। সবার জন্য যা কল্যাণকর এবং একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখতে যা যা করণীয়, আমরা সেই সিদ্ধান্তই নেব।
টেক্সটাইল মিরর : আপনার পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় শিক্ষকদের দায়িত্ব বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছিল। আপনার আমলে এই চিত্রটি কেমন?
উপাচার্য: আমার প্রশাসনে বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি, যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হবে। যার যে যোগ্যতা, তাকে সেই অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে । বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শিক্ষকদের পদায়নের ক্ষেত্রে আমরা কেবল মেধা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। যদি কারও নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকে, কেবল তাকেই সেই দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হচ্ছে; কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে বৈষম্য করার সুযোগ এখানে নেই।


