উত্তরের জেলা দিনাজপুর। এই জেলার ঢাকা–রংপুর মহাসড়কের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তাত শিল্পের এক নীরব সাক্ষী দিনাজপুর টেক্সটাইল মিলস । একসময় যেখানে হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর ছিল পরিবেশ, আজ সেখানে তালাবদ্ধ গেট, ভাঙাচোরা ভবন আর নিস্তব্ধতা।
১৯৭৮ সালে প্রায় ৩৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় দিনাজপুর টেক্সটাইল মিল। ভারতীয় প্রযুক্তির ২৫ হাজার স্পিন্ডল দিয়ে এখানে ২০, ৩২, ৪০, ৬০ ও ৮০ কাউন্টের উন্নতমানের সুতা উৎপাদন করা হতো। দেশের সেরা টেক্সটাইল মিলগুলোর মধ্যে একসময় এই মিলের নাম ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসান এবং ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে ২০০৭ সালে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে এটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
মিলের বর্তমান চিত্র অনেকটাই ধ্বংসস্তূপের মতো। ভবনগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, যন্ত্রপাতি প্রায় অচল। মিলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এত বড় শিল্পাঞ্চলে এখন কেবল একজন তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা এবং আটজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। একসময় তুলা ও সুতা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত পাঁচটি গুদামঘর বর্তমানে ভাড়া দেওয়া হয়েছে অন্য কাজে—মূলত ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য।
এই মিলের পাশেই বসবাস করেন সাবেক শ্রমিক ওয়াব আলী। প্রায় ছয় দশকের জীবনে অনেক বছরই কেটেছে এই কারখানায় কাজ করে। এখন তিনি দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। মিলের ভাঙাচোরা ভবনের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, একসময় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা এখানে এসে কাজ করতেন। অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই কর্মচাঞ্চল্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
শুধু দিনাজপুর নয়, একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে দাড়ওয়ানি টেক্সটাইল মিলস এর ক্ষেত্রেও, যা অবস্থিত নীলফামারী জেলায়। ১৯৮০ সালে জার্মান প্রযুক্তির ২৫ হাজারের বেশি স্পিন্ডল দিয়ে চালু হওয়া এই মিলও একসময় উত্তরাঞ্চলের শিল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। কিন্তু লোকসানের অজুহাতে ১৯৯৫ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন সময় চুক্তিভিত্তিকভাবে চালু থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর এর যন্ত্রপাতিও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে মিলটির অধিকাংশ ভবনই ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। চারটি গুদামের মধ্যে তিনটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে, আর বাকি ভবনগুলো দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে আছে। সেখানে এখন মাত্র একজন কর্মকর্তা এবং কয়েকজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কাজ করেন।
তবে দীর্ঘদিনের এই অচল শিল্পকে আবার সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথোরটি –এর মাধ্যমে এই দুটি মিল আধুনিকায়ন ও পুনর্বিকাশের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে উত্তরাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। কারণ একটি টেক্সটাইল মিল চালু হলে এর সঙ্গে পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, ছোট ব্যবসা ও শ্রমবাজার—সবকিছুই সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আজ যে দিনাজপুর টেক্সটাইল মিল ধ্বংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে, একসময় সেটিই ছিল এই অঞ্চলের শিল্প উন্নয়নের প্রতীক। এখন প্রশ্ন একটাই—পরিত্যক্ত এই শিল্পাঞ্চল কি আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ফিরবে?

