দেশের রফতানিমুখী প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই নীতি সহায়তার আবেদন জানানো হয়। চিঠিতে সই করেছেন সংগঠনটির সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।


বিটিএমএ জানিয়েছে, দেশের এই বৃহৎ শিল্প খাতে প্রায় ১ হাজার ৮৮৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মোট রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সহায়তা দেয় দেশীয় প্রাথমিক টেক্সটাইল মিলগুলো।

এছাড়া জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের সুতা ও কাপড় আমদানি প্রতিস্থাপন করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে এই খাত। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
চিঠিতে সংগঠনটি উল্লেখ করে, বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক সংকট, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং চলতি মূলধনের ঘাটতির কারণে টেক্সটাইল মিলগুলো চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে।

উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকদের মজুরি ও ব্যাংকের কিস্তির মতো স্থায়ী খরচ সচল রাখতে গিয়ে অনেক কারখানার মূলধন শেষ হয়ে গেছে। ফলে অনেক কারখানা বন্ধ বা আংশিক সচল রয়েছে, যা ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংকট উত্তরণে বিটিএমএর প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ঋণ পুনর্গঠনের সময়সীমা বৃদ্ধি: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ও আর্থিক পুনর্গঠনের আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো।
  • সুদের হার হ্রাস: রফতানিমুখী স্পিনিং, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাংক ঋণের কার্যকর সুদের হার কমিয়ে পুনরায় ৯ শতাংশে নির্ধারণ করা।
  • বিল দ্রুত পরিশোধ: ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় সরবরাহ করা সুতা ও কাপড়ের বিল নথিপত্র পাওয়ার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে পরিশোধ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ট্রাক ডেলিভারি চালানের তারিখকে ম্যাচিউরিটি ডেট হিসেবে গণ্য করা।
  • ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম পরিবর্তন: মেয়াদি ঋণ খেলাপি বা শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান ৩টি ওভারডিউ কিস্তির পরিবর্তে আগের মতো ৬টি কিস্তির নিয়ম ফিরিয়ে আনা।
  • ইডিএফ তহবিলের সংস্কার: এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) ঋণের সুদের হার ২ শতাংশে নামানো এবং তহবিলের সীমা সর্বশেষ ১২ মাসের রফতানি আয়ের ৬৫ শতাংশ করা।
  • সহায়ক স্কিম ও বিআরপিডি সার্কুলার: বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনে প্রাক-অর্থায়ন স্কিমের আওতায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সিআইবি মূল্যায়ন করা এবং একই গ্রুপের নিয়মিত প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বিআরপিডি সার্কুলার স্পষ্ট করা।
  • গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড: পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের (জিটিএফ) আকার বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা।
    এছাড়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ অন্যান্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর চলমান এলসি ও বিল নিষ্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি ও কার্যকর নীতিগত হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

  • বিটিএমএ আশা করছে, এই প্রস্তাবগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হলে দেশের রফতানিমুখী প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে, কর্মসংস্থান রক্ষা পাবে, ঋণ পুনরুদ্ধার গতিশীল হবে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com