বিশ্বের অন্যতম পানি-নির্ভর শিল্প হিসেবে পরিচিত টেক্সটাইল শিল্প বর্তমানে পরিবেশগত চাপের মুখে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি, শক্তি এবং রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এই শিল্প বৈশ্বিক দূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, টেক্সটাইল উৎপাদনের সবচেয়ে বেশি পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টি হয় ওয়েট প্রসেসিং ধাপে—যেখানে রং করা, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংয়ের মতো কাজ সম্পন্ন হয়।
গবেষকদের মতে, টেক্সটাইল শিল্প বছরে প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ব্যবহার করে এবং বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবহারের পরিমাণ আরও প্রায় ৬৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই সংকটের প্রেক্ষাপটে টেক্সটাইল শিল্পে নতুন কিছু প্রযুক্তি দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে, যেগুলো পানি, শক্তি ও রাসায়নিক ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে উৎপাদনকে আরও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
টেক্সটাইল ওয়েট প্রসেসিং: দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস
টেক্সটাইল উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপের মধ্যে ওয়েট প্রসেসিং সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করে। গবেষণা বলছে, শিল্পটির মোট পানির প্রায় ৭২ শতাংশ ব্যবহার হয় এই ধাপেই।
এই ধাপে সাধারণত কয়েকটি প্রক্রিয়া থাকে—
- প্রি-ট্রিটমেন্ট (ডিসাইজিং, স্কাউরিং, ব্লিচিং)
- ডাইং ও প্রিন্টিং
- ওয়াশিং
- ফিনিশিং
এই সব প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ এবং রঙের অবশিষ্টাংশ প্রায়ই নদী ও মাটিতে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য পানিতে ভারী ধাতু, উচ্চমাত্রার লবণ এবং বিষাক্ত যৌগ থাকে, যা জলজ প্রাণী ও কৃষিজমির জন্য ক্ষতিকর।
নতুন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে শিল্প
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, টেক্সটাইল শিল্পে পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি দ্রুত উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রযুক্তি ইতোমধ্যে শিল্প পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পানি ছাড়াই রং করার প্রযুক্তি
সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তির একটি হলো সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই অক্সাইড (SC-CO₂) ডাইং। এই পদ্ধতিতে পানি ব্যবহার না করে কার্বন ডাই অক্সাইডকে বিশেষ চাপ ও তাপমাত্রায় তরল-গ্যাসের মধ্যবর্তী অবস্থায় ব্যবহার করে রং করা হয়।
এই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো—
- পানি ব্যবহার প্রায় শূন্য
- রং ও CO₂ পুনরায় ব্যবহার করা যায়
- বর্জ্য পানি তৈরি হয় না
তবে এর প্রধান বাধা হলো উচ্চ প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও যন্ত্রপাতির খরচ।
ডিজিটাল প্রিন্টিং: কম পানি, কম বর্জ্য
টেক্সটাইল প্রিন্টিংয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে ডিজিটাল ইঙ্কজেট প্রিন্টিং। এতে প্রচলিত স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের মতো বড় আকারে পেস্ট ব্যবহার করতে হয় না; বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রঙের কণা সরাসরি কাপড়ে প্রয়োগ করা হয়।
এর ফলে—
- পানি ব্যবহার কমে
- রাসায়নিক অপচয় কম হয়
- জটিল ডিজাইন সহজে তৈরি করা যায়
তবে প্রি-ট্রিটমেন্ট ও পরবর্তী প্রক্রিয়া সঠিকভাবে না হলে এর পরিবেশগত সুবিধা কমে যেতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্ট্রাসাউন্ড ও ওজোন প্রযুক্তি
আরেকটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হলো আল্ট্রাসনিক প্রসেসিং, যেখানে শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়। এতে—
- রং দ্রুত কাপড়ে প্রবেশ করে
- কম তাপমাত্রায় ডাইং করা যায়
- রাসায়নিক ও শক্তির ব্যবহার কমে
একইভাবে ওজোন প্রযুক্তি বিশেষ করে ডেনিম ফিনিশিংয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে প্রচলিত ব্লিচিংয়ের তুলনায় প্রায় ৭২ শতাংশ পানি এবং ৯১ শতাংশ রাসায়নিক কম ব্যবহার করা সম্ভব।
লেজার ও প্লাজমা প্রযুক্তি
ডেনিম শিল্পে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে লেজার প্রযুক্তি, যা পাথর বা রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই কাপড়ে ফেডিং বা ডিজাইন তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে প্লাজমা প্রযুক্তি কাপড়ের পৃষ্ঠে রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে, যার ফলে কম পানি ও রাসায়নিক ব্যবহার করেই একই ফল পাওয়া যায়।
শিল্পে বাস্তবায়নের বড় বাধা
যদিও এসব প্রযুক্তি পরিবেশবান্ধব, তবু শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করতে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
- উচ্চ প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ
- বিদ্যমান কারখানার সঙ্গে প্রযুক্তির সামঞ্জস্য
- বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা
গবেষকদের মতে, এই সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে টেক্সটাইল শিল্পে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন টেকসই উৎপাদন (Sustainability) বড় শর্ত হয়ে উঠছে। ফলে পানি ও দূষণ কমাতে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

