বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মোট রফতানি সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে। তবে সাম্প্রতিক দেখা যাচ্ছে একদিকে পোশাক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে রফতানি আয় বাড়ছে।
পোশাক শিল্পের ভেতরে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে যা এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।গত ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক অসন্তোষ, ব্যাংক ঋণসংকট, উচ্চ সুদের হার এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির মতো নানা কারণে অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেননি। গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে।
তবু রফতানি আয়ের পরিসংখ্যান ভিন্ন গল্প বলছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। একক মাসের হিসাবেও প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। তাহলে কারখানা কমলেও রফতানি বাড়ছে কীভাবে?এর উত্তর লুকিয়ে আছে পোশাক শিল্পের ভেতরে চলমান কাঠামোগত রূপান্তরে।
ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর একটি অংশ বন্ধ হলেও বড় এবং প্রযুক্তিনির্ভর কারখানাগুলো উৎপাদন বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও এখন বড়, মানসম্মত ও টেকসই কারখানার দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ফলে রপ্তানির একটি বড় অংশ সীমিত সংখ্যক কারখানার হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।একই সঙ্গে পোশাক শিল্পে পণ্যের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগের তুলনায় বেশি মূল্য সংযোজিত এবং উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানি বাড়ছে। এতে প্রতি ইউনিট পোশাকের দাম বাড়ছে, যা মোট রফতানি আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও রফতানি আয়ের হিসাবকে কিছুটা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে।এছাড়া শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বড় কারখানাগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে। ফলে কম সংখ্যক কারখানা দিয়েও বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হওয়া ছোট কারখানার শ্রমিকরাও বড় কারখানায় কাজ পেয়েছেন।
তবে এই প্রবৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের জন্য পুরোপুরি স্বস্তির খবর নয়। কারণ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের হার অনেক উদ্যোক্তার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব খরচে বিমানপথে পণ্য পাঠাতে হয়েছে, যা লাভের মার্জিন কমিয়ে দিয়েছে।
এই রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদে শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নতি এবং উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা। তা না হলে কারখানা বন্ধের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা শ্রমবাজার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সংকটের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে নতুন কাঠামো। এই পরিবর্তন কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

