মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া সামরিক উত্তেজনা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সিন্থেটিক ফাইবার, সুতা ও ডাইং কেমিক্যালের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। এই বহুমুখী চাপে দেশের অনেক পোশাক কারখানা বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে পলিয়েস্টার, ভিসকস ও লায়োসেলের মতো পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক সিন্থেটিক ফাইবারের দাম গত কয়েক সপ্তাহে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি, দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোও বাড়তি দরে সুতা বিক্রি করছে।
দেশে সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নোমান গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (স্পিনিং ডিভিশন) ইঞ্জি: এনামুল করিম বলেন, ❝ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিন্থেটিক কাঁচামালের বাজারে। পলিয়েস্টার ফাইবার, ভিসকস ও লায়োসেলের মতো বিভিন্ন সিন্থেটিক ফাইবারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং অনেক সরবরাহকারী সাময়িকভাবে এসব পণ্যের নতুন অফার দেওয়া বন্ধ রেখেছে।❞
তিনি আরও জানান, ❝বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মূলত সেইসব প্রস্তুতকারকের কাছেই অর্ডার দিচ্ছেন যাদের কাছে কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। অনেক ক্রেতাই নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর ফলে সামগ্রিকভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণেও খরচ বাড়ছে, যা কাঁচা তুলার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর, তাই এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে রপ্তানিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।❞
লোহিত সাগর সংকটের কারণে বাংলাদেশের সিংহভাগ পোশাকবাহী জাহাজকে এখন আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। শিপিং কোম্পানিগুলো একই সঙ্গে ডিটেনশন চার্জ ও জ্বালানি সারচার্জ বৃদ্ধি করেছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সাংহাই থেকে ২০ ফুট কনটেইনার আমদানির খরচ ১,৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ১,৯০০ ডলারে পৌঁছেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ভাড়া ২,৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ২,৯০০ ডলার হয়েছে। প্রায় ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ এই বাড়তি পরিবহন ব্যয় উৎপাদনকারীদের মুনাফায় বড় ধস নামিয়েছে।
বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানি সিএইচটির ডাইজ ও কেমিক্যালস সরবরাহ করে থাকে আরএইচ কর্পোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এএসএম হাফিজুর রহমান নিক্সন বলেন, ❝লোহিত সাগর সংকটের কারণে অনেক চালান আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে পাঠাতে হচ্ছে, ফলে পরিবহন সময় ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত বাড়ছে এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঁচামাল ও কেমিক্যালের দাম বৃদ্ধি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ❞
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মার্চ মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯.৩৫ শতাংশ। একক মাস হিসেবে রপ্তানি কমেছে ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ৫.৫১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিট পোশাক খাত (২১.২০ শতাংশ) এবং ওভেন পোশাক খাত (১৭.৩২ শতাংশ)।
পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিট এ্যাম্পায়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো: এনায়েত হোসেন বলেন, ❝মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে পোশাক খাতে পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা তাদের ক্রয়াদেশ স্থগিত করছে। পাশাপাশি উৎপাদন সম্পন্ন হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য সময়মতো শিপমেন্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতির মধ্যে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সুতা ও ডাইজ-কেমিক্যালসের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের মূল্য সমন্বয়ে আগ্রহী নন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত থাকায় কারখানাগুলো আর্থিকভাবে চাপে পড়ছে। এ অবস্থায় অনেক কারখানার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।❞
আরএইচ কর্পোরেশনের নির্বাহী পরিচালক এএসএম হাফিজুর রহমান নিক্সন বলেন, ❝বেসিক কেমিক্যালের দাম ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ, অক্সিলিয়ারির দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং পলিয়েস্টার কেমিক্যালের দাম ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আরও স্পষ্ট হতে পারে। ❞
তিনি আরও জানান, ❝বাংলাদেশের জন্য কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। দেশে এখনো জ্বালানি ও গ্যাসের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কম খরচে সোর্সিংয়ের জন্য বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।❞
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলেও বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই খাতকে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কাঁচামাল ও পরিবহনে বর্ধিত ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনাগ্রহ, সব মিলিয়ে এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন উদ্যোক্তারা। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতার তুলনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতি এখনো কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকা আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে। এই সংকটকালীন সময়ে শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নীতি সহায়তা, কাঁচামাল আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং ব্যাংক ঋণের শর্ত শিথিল করা জরুরি। সঠিক কৌশলগত পদক্ষেপ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের বিশ্বস্ততা ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে।


