বিশ্বের সবচেয়ে বড় উল উৎপাদনকারী দেশ অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ১৯৮০–এর দশক থেকে দেশটিতে উৎপাদিত অধিকাংশ উল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সুতা তৈরির জন্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এতে দেশটির ফ্যাশন ও টেক্সটাইল শিল্প বছরে প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। এই পরিস্থিতি বদলাতে স্থানীয়ভাবে উল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও টেক্সটাইল উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির ফ্যাশন শিল্প।
বৃহস্পতিবার Australian Fashion Council (AFC) “ন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারিং স্ট্র্যাটেজি ফর অস্ট্রেলিয়ান ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্সটাইলস” নামে একটি নতুন কৌশল ঘোষণা করেছে। এতে শিল্প অংশীদার হিসেবে রয়েছে ফ্যাশন ব্র্যান্ড RM Williams এবং ফেডারেল লেবার পার্টির সংসদ সদস্য ম্যাট বার্নেলের নেতৃত্বাধীন একটি সংসদীয় কমিটি।
এই ১০ বছরের কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো দেশে উল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পোশাক উৎপাদন বাড়ানো, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পখাতে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় যুক্ত হতে পারে এবং মজুরি ও বেতনের মাধ্যমে আরও প্রায় ৮৬৪ মিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে প্রবাহিত হতে পারে।
AFC–এর নির্বাহী চেয়ারম্যান মারিয়ানে পারকোভিচ বলেন, “আমরা ১৯৮০ বা ১৯৯০–এর দশকের সব উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে চাই না। তবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে অন্তত কিছু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ফিনিশিং আবার দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যা টেক্সটাইল শিল্পের জন্য লাভজনক হবে।”
একসময় উল ও তুলাভিত্তিক সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থায় বিশ্বে নেতৃত্ব দিত অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বিদেশে কম খরচে উৎপাদনের সুযোগ এবং ১৯৮০–এর দশকে টেক্সটাইল শুল্ক প্রত্যাহারের পর ধীরে ধীরে দেশীয় উৎপাদন কমে যায়। ফলে বর্তমানে বিশ্বের বড় অংশের উল উৎপাদন করলেও তা সুতা বা কাপড়ে রূপান্তরের কাজ বিদেশেই হয়।
নতুন এই কৌশলটি দেশটির “Future Made in Australia” উদ্যোগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরিকল্পনাটির আর্থিক সহায়তা আগামী দুই বছর দেবে RM Williams।
তবে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে দক্ষ শ্রমিকের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিল্পখাতের সঙ্গে পরামর্শে অংশ নেওয়া ৩০০–এর বেশি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সেলাই, বোতামহোল তৈরি বা প্লিটিংয়ের মতো দক্ষতায় প্রশিক্ষিত কর্মীর ঘাটতি রয়েছে।
পারকোভিচ বলেন, “একসময় এসব দক্ষতা পরিবার থেকে পরিবারে ছড়িয়ে পড়ত। এখন পরিস্থিতি এমন যে সিডনিতে বোতামহোল সেলাই করার মতো দক্ষ কারিগর প্রায় একজনই আছেন।”
RM Williams–এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা তারা মোসেস বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প খাত অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। উৎপাদনকারীদের টিকে থাকতে হলে পর্যাপ্ত অর্ডার, প্রযুক্তি এবং দক্ষ শ্রমশক্তি দরকার।
এই উদ্যোগের একটি উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ৭৫ বছর পুরোনো নিটিং মিল Silver Fleece–এর পুনরুজ্জীবনের কথা উল্লেখ করা হয়। ডিন ও মেলানি ফ্লিনটফট দম্পতি গত বছর দেউলিয়া হওয়ার মুখে থাকা প্রতিষ্ঠানটি কিনে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নতুনভাবে চালু করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সোয়েটার, স্কুল ইউনিফর্ম ও সরকারি পোশাক তৈরি করে।
ডিন ফ্লিনটফট বলেন, “প্রযুক্তি এখন অনেক উন্নত। আমাদের কারখানায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুব কম মানবশ্রমে সোয়েটার তৈরি করা যায়। আমরা উৎপাদন বাড়াতে পারি, তবে এর জন্য বিনিয়োগ ও চাহিদা দরকার।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার, শিল্পখাত এবং ক্রেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে অস্ট্রেলিয়া আবারও নৈতিকভাবে সংগৃহীত কাঁচামাল ও উচ্চমানের টেক্সটাইল পণ্যের জন্য বিশ্বে পরিচিত হতে পারে।
লেখাঃ লরেন সেমস, ফিনান্সিয়াল রিভিউ
অনুবাদঃ বখতিয়ার নাসিফ আহাম্মেদ

