বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত সাম্প্রতিক সময়ে নানা চাপে রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩.৭৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৫.৭৯ বিলিয়ন ডলারে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)—যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক বাজার—সেখানেও রপ্তানি কিছুটা কমেছে। জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে ইইউতে পোশাক রপ্তানি প্রায় ১.০৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭.৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সতর্ক ক্রয়নীতি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা—এসব কারণ রপ্তানি কমার পেছনে কাজ করছে। তবে এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে—ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তার।
বিশেষ করে চীনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন Shein ও Temu-এর মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে ছোট ছোট পণ্য পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, এই “পার্সেল অর্থনীতি” এখন এত বড় আকার নিয়েছে যে তা বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫০ ইউরোর কম মূল্যের প্রায় ৫.৮ বিলিয়ন পণ্য ইইউতে প্রবেশ করেছে, যার ৯১ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। ফলে প্রচলিত বড় আকারের আমদানি ব্যবস্থার বাইরে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ইইউর ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (EBA) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে আসছে, এবং ইইউতে রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশই টেক্সটাইল খাতের। তাই ইউরোপীয় বাজারে যেকোনো কাঠামোগত পরিবর্তন সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলে।
এদিকে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ইইউ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছোট পার্সেল আমদানির ওপর শুল্ক সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি ছোট চালানের ওপর নির্দিষ্ট হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ শুল্ক ব্যবস্থা চালু হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্মগুলোকে আমদানিকারক হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং পণ্যের শুল্ক, মান ও কাগজপত্রের দায়ভার তাদেরই নিতে হবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, এতে ছোট পার্সেলভিত্তিক ই-কমার্সের সুবিধা কমে গিয়ে বড় পরিসরের প্রচলিত আমদানি ব্যবস্থায় আবার ভারসাম্য ফিরতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নীতিগত সুবিধা পেলেই হবে না—বাংলাদেশকে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার করার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুবাদঃ বখতিয়ার নাসিফ আহাম্মেদ
লেখকঃ মোস্তাফিজ উদ্দীন, ব্যাবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড

