ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল খাতের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বেসরকারি ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই খাতের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১৬ জন ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন মন্ত্রী ও তিনজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে পরিচিত পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের এই উপস্থিতি শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
সংসদে বাড়ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের উপস্থিতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবসায়ী ছিলেন। নির্বাচনের ফলাফলেও ব্যবসায়ী প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদে জায়গা করে নিয়েছেন।
নির্বাচিত এসব জনপ্রতিনিধির অনেকেই বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সমালোচকদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে ব্যবসায়ী নেতাদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, তারা ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই নির্বাচিত হয়েছেন এবং জনকল্যাণে কাজ করবেন।
মন্ত্রিসভায়ও পোশাক খাতের প্রতিনিধিত্ব
নবগঠিত মন্ত্রিসভায় তৈরি পোশাক খাতের তিনজন পূর্ণমন্ত্রী ও তিনজন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন,
- খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়
- আফরোজা খানম রিতা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়
- জাকারিয়া তাহের সুমন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন—
- মো. শরীফুল আলম, বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র–পাট মন্ত্রণালয়
- শামা ওবায়েদ ইসলাম, পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়
- আহম্মদ সোহেল মনজুর, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রতিনিধিত্ব শিল্পের বাস্তব সমস্যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে।
নির্বাচিত শিল্পোদ্যোক্তা সংসদ সদস্যরা
পোশাক ও টেক্সটাইল খাতসংশ্লিষ্ট নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—
- পিরোজপুর–২: আহম্মদ সোহেল মনজুর
- টাঙ্গাইল–৪: মো. লুৎফর রহমান মতিন
- ময়মনসিংহ–৫: মোহাম্মদ জাকির হোসেন বাবলু
- কিশোরগঞ্জ–৬: মো. শরীফুল আলম
- মানিকগঞ্জ–৩: আফরোজা খানম রিতা
- মুন্সিগঞ্জ–১: শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ
- ফরিদপুর–২: শামা ওবায়েদ ইসলাম
- সিলেট–১: খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির
- হবিগঞ্জ–৪: এস এম ফয়সাল
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৩: ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল
- কুমিল্লা–৮: জাকারিয়া তাহের সুমন
- কুমিল্লা–৯: মো. আবুল কালাম
- চাঁদপুর–৪: মো. আবদুল হান্নান
- নোয়াখালী–২: জয়নুল আবদিন ফারুক
- লক্ষ্মীপুর–১: শাহাদাত হোসেন সেলিম
- চট্টগ্রাম–৮: এরশাদ উল্লাহ
এদের অধিকাংশই বিভিন্ন গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের মালিক, উদ্যোক্তা বা পরিচালক হিসেবে দেশের রপ্তানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছেন।
সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনেকেই দেশের বড় গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে—
আল-মুসলিম গ্রুপ, এনভয় টেক্সটাইলস, শেলটেক গ্রুপ, মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, টিএস ডিজাইনস লিমিটেড, মতিন স্পিনিং মিলস, রামিসা বিডি গ্রুপ, ইউনিটেক্স গ্রুপ, সাহিব অ্যাপারেলস, ফারুক গার্মেন্টস, মাল্টিমোড গ্রুপ এবং সায়েহাম গ্রুপসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও পোশাক উদ্যোক্তা
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পোশাক খাতের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন হিসাববিদ (এফসিএমএ) মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি নারায়ণগঞ্জভিত্তিক হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটি সোয়েটার ও নিটওয়্যার উৎপাদন ও রফতানির সঙ্গে যুক্ত।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সম্মানে রাজধানীর আর্মি গলফ ক্লাবে ইফতার ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিজিএমইএ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্পোদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেন, সংসদে পোশাক শিল্পের সমস্যা, সম্ভাবনা ও নীতিগত বিষয়গুলো তুলে ধরতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।
বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, পোশাক শিল্প থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা খাতটির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত। তাদের অভিজ্ঞতা শিল্পের সংকট নিরসন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
টাঙ্গাইল–৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. লুৎফর রহমান বলেন, বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে শিল্পের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান জরুরি। এজন্য নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নীতি নির্ধারণে শিল্পের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে এই খাত থেকে। ফলে সংসদ, মন্ত্রিসভা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ খাতের উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি শিল্পের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিত্ব বাড়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বার্থসংঘাত এড়ানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

