দেশের ৯৬ শতাংশের বেশি পুলিশ সদস্য নতুন প্রবর্তিত ইউনিফর্ম বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন। অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তারা জানিয়েছেন।
সোমবার (২ মার্চ) দেশের ৬৪টি জেলা ও বিভিন্ন ইউনিটে আয়োজিত কল্যাণ সভায় প্রায় দুই লাখ পুলিশ সদস্য উন্মুক্ত ভোটাভুটিতে অংশ নেন।
হাত তুলে মতামত দেওয়ার মাধ্যমে তারা জানান, নতুন ‘আয়রন’ রঙের শার্ট ও কফি রঙের প্যান্টের পরিবর্তে আগের নীল ইউনিফর্মে ফিরে যেতে চান।জেলা পর্যায়ের ফলাফলে দেখা যায়, ঢাকা জেলা পুলিশ লাইন্সে প্রায় ৯৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৯৬ শতাংশ, সিরাজগঞ্জ ও নোয়াখালীতে ৯৯ শতাংশ এবং টুরিস্ট পুলিশের প্রায় ১০০ শতাংশ সদস্য পুরোনো ইউনিফর্মের পক্ষে মত দেন।
টুরিস্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের ১,৪০০ সদস্যের মধ্যে মাত্র পাঁচজন নতুন রঙের ইউনিফর্ম চেয়েছেন।বরিশালের ট্রাফিক সার্জেন্ট রাজিব আল হাসান জানান, তিন মাস ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে নতুন ইউনিফর্মে বাতাস চলাচল কম হয়, ফলে গরমে তা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
ঢাকার এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ সময় ডিউটি করলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তাপজনিত অসুস্থতার কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।
১৯৮০ সালের পর দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি। ঢাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর মার্চ মাসে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। মাসের শেষের দিকে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, গাঢ় কফি রঙের কাপড় তাপ বেশি শোষণ করে, যা উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি হালকা রঙ ও বাতাস চলাচলযোগ্য কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দেন।পুলিশের দাবি, পরীক্ষায় দেখা গেছে নতুন ইউনিফর্মের কাপড়ে প্রয়োজনীয় ‘ময়েশ্চার ম্যানেজমেন্ট’ বা ঘাম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম।
চুক্তি অনুযায়ী ‘উইকিং ক্যাপাসিটি’ ৬ থেকে ১০ সেন্টিমিটার থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় তা পাওয়া গেছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। কাপড়ের ঘনত্বও নির্ধারিত ২০৫ জিএসএমের পরিবর্তে ১৯৩ জিএসএম পাওয়া গেছে।ক্রয়সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত ইউনিটের জন্য ৭ লাখ মিটার আয়রন টিসি প্লেইন ফ্যাব্রিক প্রায় ৩০ দশমিক ৮০ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে। জেলা ইউনিটের জন্য ১০ লাখ ২০ হাজার মিটার কফি টিসি টুইল কেনা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৩৭ কোটি টাকায়। একই কাপড়ের আরও ৫ লাখ মিটার মেট্রোপলিটন ইউনিটের জন্য কেনা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩০ কোটি টাকায়।
কাপড় সরবরাহকারী নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম দাবি করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্যুরো ভেরিটাস ও এসজিএসের পরীক্ষায় নমুনা উত্তীর্ণ হওয়ার পরই সরবরাহ করা হয়েছে। তার মতে, অসন্তোষ মূলত রঙ নিয়ে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, সব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করে সরকারের কাছে সুপারিশ আকারে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের নির্দেশনা ও অধিকাংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।

Leave a Reply