চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাকের বাজারে বড় ধরণের মন্দার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। এ সময়ে শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজারভিত্তিক শেয়ার হারিয়েছে বাংলাদেশ। পণ্যের বিক্রয়মূল্য ও অর্ডারের পরিমাণ—দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এই আট মাসে বাংলাদেশের আয় প্রায় ১.৫৮ বিলিয়ন (১৫৮ কোটি) ইউরো কমেছে।
ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি) জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউ-এর ২৭টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১.৬৭ শতাংশ কমে ১১.৯৩ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ১৩.৫০ বিলিয়ন ইউরো।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সময়ে ইইউ-এর সার্বিক পোশাক আমদানি সংকুচিত হয়েছে মাত্র ৩.৮৩ শতাংশ, যার বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের গতি ছিল প্রায় তিনগুণ। ফলে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ২১.৫৪ শতাংশ থেকে কমে ১৯.৭৮ শতাংশে ঠেকেছে।বিএভি-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল জানান, অর্ডারের পরিমাণের চেয়ে পণ্যের গড় মূল্য কমে যাওয়াটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই আট মাসে পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি ৪.৫৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬৬.৭৬ মিলিয়ন কেজিতে। অন্যদিকে, প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ৭.৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৩.৭৬ ইউরোতে নেমে এসেছে, যা গত বছর ছিল ১৪.৮৭ ইউরো।
বাংলাদেশের পোশাক খাত যখন এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে চীন ও ভিয়েতনাম। ইইউ-এর সামগ্রিক পোশাকের চাহিদা কম থাকলেও শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে চীন তাদের রপ্তানি ২.৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯.৭১ বিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত করেছে। এতে চীনের বাজারের অংশীদারিত্ব ৩০.৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২.৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
অন্যদিকে, ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির ওজন ৫.১৩ শতাংশ কমলেও, পণ্যের দর বাড়িয়ে তারা আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১০.১১ শতাংশ বাড়িয়ে (২৮.৮২ ইউরো) দেশটির মোট আয় ৩.০০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে ভিয়েতনামের অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৯৮ শতাংশে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন—শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানের রপ্তানিও নিম্নমুখী ছিল। তবে শতকরা আয়ের বিচারে বাংলাদেশের মতো এত বড় ধস অন্য কোনো দেশে দেখা যায়নি।
এছাড়া প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্যের দিক থেকেও চীনা (১৯.৮২ ইউরো) ও ভিয়েতনামী (২৮.৮২ ইউরো) পোশাকের চেয়ে বাংলাদেশি পোশাক (১৩.৭৬ ইউরো) অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে পুরো আট মাসের সার্বিক মন্দার মাঝেও আগস্ট মাসে এসে ইউরোপের বাজারে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে ইইউ-এর মোট পোশাক আমদানির মূল্য ০.৭২ শতাংশ বেড়েছে। খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করলেও বিশ্ববাজারে পুনরায় অবস্থান মজবুত করতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত শিপমেন্টের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং দরপতন ঠেকাতে কঠোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


