হরমুজ প্রণালি—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহনের বড় অংশই এই পথ দিয়ে হয়। সম্প্রতি এই প্রণালি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতি খুব সহজে রেহাই পাবে না।
বাংলাদেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, সরাসরি এই পরিবর্তনের অভিঘাতে পড়তে পারে। কারণ দেশের জ্বালানির বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে অতিরিক্ত টোল যুক্ত হওয়ায় জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিল্প কারখানার ওপর।
পোশাক শিল্প এমনিতেই কম খরচে উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে। পাশাপাশি পলিয়েস্টারের মতো কাঁচামালের দামও বেড়ে যেতে পারে, যা মূলত তেলনির্ভর। ফলে কারখানাগুলোকে একই পণ্যের জন্য বেশি খরচ করতে হবে, অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা আগের মতোই কম দামে পণ্য কিনতে চাইবে। এতে মুনাফা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
শুধু উৎপাদন খরচই নয়, পরিবহন খরচও বাড়বে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোকে এখন অতিরিক্ত ফি দিতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত ফ্রেইট চার্জে যুক্ত হবে। এর ফলে রপ্তানি পণ্যের খরচ বাড়বে এবং শিপমেন্টে বিলম্বও দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক।
এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। একদিকে জ্বালানি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। এতে ডলার সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু পোশাক খাত নয়, অন্যান্য শিল্প ও ব্যবসাও এর বাইরে থাকবে না। পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দেবে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো বেশি চাপে পড়বে, কারণ তাদের পক্ষে বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া কঠিন।
তবে এই পরিস্থিতি একটি সতর্কবার্তাও হিসেবে দেখা যেতে পারে। জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজা, উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ এর প্রভাব গভীর ও বহুমাত্রিক। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

