মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল ও লজিস্টিক খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বাণিজ্যে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো জাহাজ ভাড়া ও বিভিন্ন সারচার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিপিং খরচ ও নতুন সারচার্জের বোঝা
দেশের পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে ‘জরুরি জ্বালানি সারচার্জ’ (ইএফএস)। ফলে চীন থেকে পণ্য আমদানিতে ২০ ফুটের কনটেইনার ভাড়া ১৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ১৯০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির খরচও প্রায় ২৬-২৭ শতাংশ বেড়েছে।
আমদানিতে স্থবিরতা ও পণ্যের দাম বৃদ্ধি
জাহাজ ভাড়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে গমের মতো নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক আমদানিকারক এখন নতুন করে এলসি খোলা বা পণ্য আনা স্থগিত রেখেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি টনে জাহাজ ভাড়া ২০-২৫ ডলার এবং গমের দাম প্রায় ৩০ ডলার বেড়েছে। এই অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আপাতত বাজার পর্যবেক্ষণ করছে।
জ্বালানি ও ডিটেনশন চার্জের প্রভাব
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানি মায়েরস্কসহ ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস, সিএমএ সিজিএম-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাড়তি পরিচালন ব্যয় গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ৬ এপ্রিল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ডিটেনশন চার্জ ৭-১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এছাড়া এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপগামী রুটগুলোতে বড় অঙ্কের জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাসের আশঙ্কা
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, জাহাজ ভাড়া বাড়লেও বিদেশি ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে রাজি হন না। ফলে এই অতিরিক্ত খরচ উদ্যোক্তাদের নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে, যা তাদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে।
শিপিং কোম্পানিগুলোর যুক্তি
শিপিং এজেন্টদের মতে, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৮ ডলারে পৌঁছেছে এবং বীমা খরচ বেড়েছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া সংঘাত এড়াতে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা জ্বালানি খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই তারা চার্জ বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লজিস্টিকস ব্যয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এপ্রিল নাগাদ এর প্রভাব বাজারে পূর্ণরূপে অনুভূত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের এখন আরও সুনিপুণ লজিস্টিক পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে।

