নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় বকেয়া বেতন, ঈদ বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা পরিশোধ না করাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের অসন্তোষ বাড়ছে। গত কয়েক দিনে জেলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
শিল্পাঞ্চল সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছর ঈদ সামনে এলেই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সময়মতো শ্রমিকদের পাওনা না দিলে অসন্তোষ দ্রুত আন্দোলনে রূপ নেয়, যার প্রভাব পড়ে সড়ক যোগাযোগ ও জনজীবনে।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ করেন মোতালেব মনোয়ারা গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরা। শ্রমিকদের অভিযোগ, মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে কারখানা বন্ধ রেখে তাদের পাওনা পরিশোধ করছে না।
শ্রমিকরা জানান, তাদের তিন মাসের বকেয়া বেতন এখনও দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ১৫ জন নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ভাতা, ঈদ বোনাস ও সার্ভিস বেনিফিটও বকেয়া রয়েছে। এসব পাওনা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে ফতুল্লার গাবতলী এলাকায় অবস্থিত সেঞ্চুরি গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক অবরোধ করে প্রায় এক ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন। এতে সড়কটিতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন বকেয়া রয়েছে। একাধিকবার বিষয়টি কারখানা কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা সড়কে নেমে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।
এর একদিন আগে বুধবার (১১ মার্চ) রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার খাদুন এলাকায় ভুঁইয়া ফেব্রিকস নামে একটি পোশাক কারখানার প্রায় ৪০০ শ্রমিক ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে মহাসড়কে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
শ্রমিকদের দাবি, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এবং ঈদ বোনাস দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। মালিকপক্ষ বারবার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে বুধবার সকালে শ্রমিকরা জানতে পারেন, তাদের বকেয়া বেতন ও বোনাস আগামী ১৮ মার্চ পরিশোধ করা হবে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেন।
একই দিনে ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের বিসিক এলাকায় ইউরো নিটস্পিনিং গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরাও বেতন ও বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিল্পাঞ্চলে বেতন ও বোনাস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দেখা দিলে দ্রুত শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঈদের আগে পরিবারের খরচ ও বাড়ি ফেরার প্রস্তুতির কারণে শ্রমিকদের কাছে বেতন ও বোনাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ঈদের আগে শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের দাবিতে শহরে মানববন্ধন করেছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, ঈদকে সামনে রেখে শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা, ঈদ বোনাস এবং চলতি মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন দ্রুত পরিশোধ করা প্রয়োজন।
শ্রমিক নেতাদের মতে, কম মজুরিতে সারা বছর ধারদেনা করে চলতে হয় শ্রমিকদের। তাই ঈদের আগে বকেয়া ও বোনাস পেলে তারা পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপদে বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা জোরদার এবং পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণেরও দাবি জানান তারা।
তারা আরও বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগেভাগেই উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ঈদের আগে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়।

